Wednesday, July 3, 2013

সিরাজপত্মী লুৎফুন্নেসা ও তার বংশধর

ইউরোপীয় চিত্রকরের তুলিতে প্রহসনের যুদ্ধের পর ক্লাইভের সামনে অবনত মস্তকে মীরজাফর
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা পত্মী লুৎফুন্নেসা। প্রথমে তিনি ছিলেন সিরাজের মা আমেনা বেগমের একজন হিন্দু পরিচারিকা। তাকে ‘রাজ কুনোয়ার’ বলে ডাকা হতো। তার সৌন্দর্য এবং মধুর ব্যবহারে সিরাজ আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে সিরাজ তাকে বিয়ে করেন এবং তার নাম রাখেন লুৎফুন্নেসা বেগম।
সিরাজের প্রথম বিবাহ হয় ১৭৪৬ সালের আগস্ট মাসে ইরাজ খান নামে একজন অভিজাত ব্যক্তির কন্যা উমদাতুন্নেসার (বহু বেগম) সাথে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে সিরাজের কোনো সন্তান ছিল না।
নবাব আলীবর্দী খাঁ ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে রেখে নাতি সিরাজকে গড়ে তুলে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করিয়েছিলেন নিজের পরিবারে আশৈশব সুশিক্ষিতা পরমা সুন্দরী লুৎফুন্নেসাকে। বিপুল উৎসব আয়োজন করে বিয়ে হয়। লুৎফুন্নেসা বেগম সিরাজের প্রথম সহচরে পরিণত হন। তার প্রথমা স্ত্রী সব সময় আনন্দ-বিলাসেই মগ্ন থাকতেন। পলাশীর বিপর্যয়ের পর সিরাজ একাকী পলায়নের সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাকে সঙ্গী করার জন্য আকুল আবেদন জানান। সিরাজ তার এই বিশ্বস্ত স্ত্রী, একমাত্র কন্যা জোহরা এবং একজন অনুগত খোজাসহ ১৭৫৭ সালের ২৪ জুন গভীর রাতে নিভৃতে মুর্শিদাবাদ শহর ত্যাগ করেন।
হতভাগ্য সিরাজ মীরজাফরের ভ্রাতা মীর দাউদের হাতে অচিরেই ধরা পড়েন রাজমহলে। মীরজাফরের জামাতা মীর কাসিম সেখানে গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আসেন মুর্শিদাবাদে।
সিরাজউদ্দৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর মীর কাসিম লুকানো সোনাদানার সন্ধান চেয়ে লুৎফুন্নেসার ওপর অত্যাচার করেন। এ দিকে মীরজাফরের পুত্র মিরনের আদেশে মুহাম্মদী বেগ ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মিরনের নির্দেশে তার মৃতদেহ হাতির পিঠে করে মুর্শিদাবাদ নগরে অত্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।
স্বামীর শাহাদতের পর সিরাজের তরুণী বিধবা স্ত্রী লুৎফুন্নেসা মীরজাফর ও মিরনের বিবাহ করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সারা জীবন স্বামীর কবরে পবিত্র কুরআন শরিফ পাঠ করে সময় অতিবাহিত করেছেন। সিরাজের চরিত্রের ওপর লুৎফা বেগমের বিরাট প্রভাব পড়েছিল। উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারিণী লুৎফা সারা জীবন সিরাজউদ্দৌলার প্রতি অনুরক্তা ছিলেন। নবাবের পতনের পর লুৎফুন্নেসা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করেন। লুৎফুন্নেসা খোশবাগে সিরাজের কবরের পাশে একাটি কুঁড়েঘর তৈরি করে বাকি জীবন সেখানেই কাটিয়ে দেন। কত বড় মহীয়সী নারী হলে সব লোভ ও আয়েশ পরিত্যাগ করে জীবনের বেশির ভাগ সময় প্রাণাধিক প্রিয় স্বামীর স্মরণে কাটিয়ে দেয়া যায়।
তিনি যে মাসোয়ারা পেতেন, তা দিয়ে প্রতিদিন কাঙালি ভোজের ব্যবস্থা করতেন। সুদীর্ঘ ৩৩ বছর এভাবে স্বামীর সেবা করে ১৭৯০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি পরলোক গমন করেন। লুৎফুন্নেসার একনিষ্ঠ প্রেম, ভালোবাসা ও ত্যাগ ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
যাকে নিয়ে এ লেখা, পলাশীর ইতিহাসে তার উপস্থিতি কখনো দীপ্তসরব হয়ে ওঠেনি; কিন্তু পলাশী কখনো তাকে পাশ কাটিয়েও যেতে পারেনি। পলাশীর ২৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। দুর্ভাগা নারী লুৎফুন্নেসা। ইতিহাসে উপেক্ষিতাই রয়ে গেছেন তিনি।
সিরাজকে হত্যা করে নবাব হলেন মীরজাফর। তাকে কথিত নবাব বানালেন কাইভ। সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৫ বছরের মির্জা মেহেদীকে হত্যা করা হলো মীরজাফর ও মিরনের নির্দেশে অন্ধকার কারাগার প্রকোষ্ঠে। কারাগারে বন্দী হলেন সিরাজের মা আমেনা বেগম, নবাব আলীবর্দী খাঁর (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি.) পতœী শরফুন্নেসা, নবাব সিরাজউদ্দৌলার অর্ধাঙ্গিনী লুৎফুন্নেসা এবং তার চার বছরের শিশুকন্যা জোহরা। ঘসেটি বেগমকেও কারাগারে পাঠানো হলো। ঢাকার গা ঘেঁষে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গার ওপারে জিনজিরার প্রাসাদে নির্বাসন দেয়া হলো সবাইকে। নামে ‘প্রাসাদ’, আদতে কয়েদখানার চেয়েও খারাপ।
সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর মীরজাফর সিদ্ধান্ত দিলেনÑ লুৎফুন্নেসা, জোহরা, আমেনা বেগম, ঘসেটি বেগম ও শরফুন্নেসাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে জিনজিরায়। ১৭৫৮ সালে নবাব পরিবারের এই সদস্যদের ঠাসাঠাসি করে তোলা হলো একটি সাধারণ নৌকায়। ঢাকায় তাদের খাওয়া-দাওয়া বাবদ সামান্য অর্থ আসতো অনিয়মিত। ফলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করতে হয়েছে তাদের। ১৭৬৩ সালে রেজা খানকে ঢাকার নায়েব সুবাদার করা হলো। তিনি নবাব পরিবারের এই নারীদের জন্য সামান্য ভাতা বরাদ্দ করেন। ১৭৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে জিনজিরার বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে মুর্শিদাবাদ এলেন লুৎফুন্নেসা, তার কন্যা জোহরা এবং আলীবর্দী খাঁর পতœী শরফুন্নেসা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লুৎফুন্নেসা ও তার কন্যার ভরণপোষণের জন্য মাসিক ৬০০ টাকা বরাদ্দ করেছিল। কাইভের নির্দেশে লুৎফুন্নেসা ও তার কন্যা জোহরাকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়েছিল। তার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার দুঃসাহস ছিল না ‘কাইভের গর্দভ’ মীরজাফরের।
পাপীষ্ঠ মীরজাফর ১৭৬৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দুরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করেন। এর আগে ১৭৬০ সালের ২৬ জুন মিরন কয়েকজন অনুচরকে পাঠিয়েছিলেন জিনজিরায়। মুর্শিদাবাদে নেয়ার নাম করে দুই বোন আমেনা বেগম ও ঘসেটি বেগমসহ সিরাজের নিকটাত্মীয়দের নৌকায় তুলে বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর সঙ্গমস্থলে মাঝনদীতে পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক মিরনের অনুচর আসফ খাঁ নৌকার তলার খিলগুলো খুলে দিয়েছিল। সলিল সমাধি হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীতে সিরাজের মাতা ও খালার। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে ১৭৬০ সালের ৪ জুলাই মীরজাফরের পুত্র মিরনের বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছিল।
বিপর্যস্ত জীবনে দুঃখ, বেদনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে গেল লুৎফুন্নেসার। মেয়ের বিয়ে হলো অতি সাধারণভাবে। জামাই মীর আসাদ আলী খান। জোহরার এক পুত্র ও চার কন্যা। পুত্রের নাম শমসের আলী খান। কন্যাদের নাম সরযুনিসা, আমাতুন নিসা, সাকিনা ও আমাতুল মাহদী। জামাতা মীর আসাদ আলী খান মারা গেলেন হঠাৎ। সামলে উঠতে না উঠতে এলো আরেকটি আঘাতÑ ১৭৭৪ সালে জোহরা চিরদিনের মতো চলে গেলেন। কন্যার মৃত্যুতে এবার লুৎফুন্নেসা ভেঙে পড়লেন। ৬০০ টাকা মাসোয়ারায় পাঁচ-পাঁচটি পিতৃ-মাতৃহারা নাতি ও নাতনীকে নিয়ে জীবন যে চলছিল, তা নয়। কিন্তু একে একে চারজন বিবাহযোগ্যা মেয়ের দেখা দিলো সমস্যা। কোথায় টাকা পাবেন? কে তাকে সাহায্য করবে? উপায়ান্তর না দেখে ১৭৮৭ সালের মার্চ মাসে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছে ভাতা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। বললেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু এবং তার যাবতীয় মালামাল ও সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়া ছাড়াও বারবার চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ঝড়-ঝঞ্ঝার প্রবল তরঙ্গ বইয়ে দেয়া হয়েছে আমার ওপর।’ তবু লুৎফুন্নেসার আবেদন নাকচ করে দিলেন কর্নওয়ালিস। ওই ভাতা বাদে মাসে আরো ৩০৫ টাকা পেতেন কুরআনখানি, দানখয়রাত এবং খোশবাগে আলীবর্দী খাঁ ও সিরাজউদ্দৌলার সমাধি দেখভালের জন্য। ১৭৯০ সালের নভেম্বর মাসে স্বামীর কবরের পাশে নামাজরত অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ শয্যা রচিত হলো প্রাণপ্রিয় স্বামীর কবরের পাশে। ইতিহাস এ পর্যন্ত এসে নীরব হয়ে গেছে, থেমে গেছে। এই ভাগ্যহীনা নারীর অসহায় এক নাতি ও চার নাতনীর আর খোঁজখবর রাখেনি কেউ।
ঢাকার জিনজিরার প্রাসাদ কয়েদখানার প্রতিটি ইটে মিশে থাকা লুৎফুন্নেসা, আমেনা বেগম, শরফুন্নেসার বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস, আর্তনাদ ও আহাজারির কান্নার আওয়াজ ইতিহাসের ছাত্র কান পাতলেই শুনতে পাবে। সেই ইতিহাস আমাদের পূর্বপুরুষের অব্যক্ত বেদনার মর্মান্তিক ইতিহাস।
সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র নাতি জোহরার পুত্রের নাম শমসের আলী খান। তার একমাত্র পুত্র লুৎফে আলী। ১৮৩৩ সালে তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হন একমাত্র কন্যা ফাতেমা। তার গর্ভে জন্ম নেন তিন কন্যা লতিফুন্নেসা, হাশমত আরা বেগম ও উলফুন্নেসা। ফাতেমা বেগম মারা যান ১৮৭০ সালে। হাশমত আরা বেগমের বিয়ে হয় বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান কুখ্যাত অত্যাচারী দেবী সিংহের পালনকর্তা মোহাম্মদ রেজা খানের ভাই আহমদ খানের অধস্তন পুরুষ সৈয়দ আলী রেজার সাথে। আলী রেজা ও হাশমত আরা যথাক্রমে ১৮৯৭ ও ১৯৩১ সালে মারা যান। তাদেরর পুত্র জাকি রেজা ও কন্যা তিলা তারা বেগম। জাকি রেজা মুর্শিদাবাদের সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন। এই পরিবারের দুর্গতির কথা ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর কর্ণগোচর হলে তিনি ১৯১৩ সালে তৎকালীন বাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছিলেন জাকিকে একটি ভালো চাকরি দেয়ার জন্য। জাকি রেজার চার পুত্র গোলাম হায়দার মহসিন রেজা, গোলাম আহমদ, গোলাম মর্তুজা, রেজা আলী এবং দুই কন্যা খুরশিদা বেগম ও মুগরা বেগম। এরা দীর্ঘ সময় মুর্শিদাবাদে ছিলেন। চলে আসেন ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। গোলাম হায়দার ও গোলাম আহমদ বদলি হয়ে চলে যান করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোরে। রেজা আলী থেকে যান খুলনা কাস্টমে। গোলাম মর্তুজা যোগ দেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে। সাপ্তাহিক পলাশী (সম্পাদক ড. মুহাম্মদ ফজলুল হক) পত্রিকায় ১৪ আগস্ট ১৯৯২ সংখ্যায় এক সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সপ্তম বংশধর গোলাম মর্তুজা ৮২ বছর বয়সে গত ১৯ জুলাই ১৯৯২ খ্রি. বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে খুলনার মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোডে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাকে টুটপাড়া গোরস্থানে ২০ জুলাই দাফন করা হয়। গোলাম মর্তুজার পুত্র গোলাম মোস্তফা একজন ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের। আছেন ঢাকায়। অন্য পুত্র গোলাম মোহাম্মদ খুলনাতেই ব্যবসায় করছেন।
খান্দানের বাইরে বিয়ে হয়েছিল সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র মেয়ে জোহরার একমাত্র পুত্র শমসের আলী খানের দৌহিত্রী ফাতেমা বেগমের মেয়ে উলফুন্নেসার, মুর্শিদাবাদের সুলতান আমির মির্জার সাথে। তাদের পাঁচ পুত্র ও পাঁচ কন্যা। এক পুত্রের বংশধর সৈয়দ আহমদ মির্জার তিন পুত্র ওয়াসেক আলী মির্জা, ইশতিয়াক মির্জা ও ইমতিয়াজ মির্জা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এরা সবাই খুলনাতেই আছেন। ছোটখাটো চাকরি করছেন কালেক্টরেটে। বাংলাদেশ থেকে কোনো সরকারি সাহায্য বা ভাতা তারা আজ পর্যন্ত পাননি। এ ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাস।
আমাদের জাতীয় জীবনে সিরাজউদ্দৌলার বংশধরেরা আজো অবহেলিত ও উপেক্ষিত। জাতির জন্য সত্যিই এটা চরম বেদনাদায়ক ঘটনা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলোÑ ইতিহাস থেকে কেউ কিছু শেখে না। 

লেখক : মো: জোবায়ের আলী জুয়েল। সাহিত্য সংগঠক, রংপুর

No comments:

Post a Comment