মুহাম্মদ কামারুজ্জামান
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক ময়দান, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম, গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকতা ও কূটনৈতিক মহলসহ দেশের সর্বত্র একটি আলোচিত নেতৃত্ব। এক কথায় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইসলামী আন্দোলনের এক বীর সেনানী মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। শুধু তাই নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আজ কামারুজ্জামান একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সংগঠক আজকের সফল রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। বাংলাদেশে আদর্শ ও ইসলামী রাজনৈতিক ধারা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বিগত চার দশক ধরে তার মেধা মনন বুদ্ধি দিয়ে নিরলস পরিশ্রম ও আন্দোলন সংগ্রামে আত্মনিবেদিত এক প্রাণ। ১৯৭০-র দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সফল ও মেধাবী ছাত্রনেতা হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে মেধার বিকাশ ও গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮০-র দশকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান যেমন একদিকে সফল রাজনীতিবিদ ও সংগঠক অন্যদিকে একজন সফল সাংবাদিক ও সম্পাদক। তারই সফল সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক সোনার বাংলা আজ বাংলাদেশের শীর্ষে অবস্থানকারী সাপ্তাহিক পত্রিকা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মুহাম্মদ কামারুজ্জামান তাই আজ সরকার ও ইসলাম বিরোধী রাজনৈতিক মহলের মারাত্মক অপপ্রচারের শিকার। সরকারের রোষানলে পড়ে দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান আজ কারাগারের এক দুর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছেন।
যে কথিত অভিযোগে কামারুজ্জামানকে আজ কারাগারে দণ্ড দেয়া হলো। সে অভিযোগের কোনো রকম সত্যতা নেই। শেরপুরসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আজ যে কথিত অভিযোগ আনার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে তার মূল কারণ হলো তিনি আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী ও আদর্শিক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। তিনি একজন জাতীয় রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ। রাজনৈতিক ময়দানে তার অবদান দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির সহ্য হচ্ছে না। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্যতম এই সিপাহশালার মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ইসলাম বিরোধী শক্তির এক মহাআতঙ্ক। তাই তার বিরুদ্ধে আজ যুদ্ধাপরাধের কথিত অভিযোগ।
রাজনৈতিক ময়দানে প্রত্য অংশগ্রহণের পাশাপাশি মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন, গণতন্ত্র ও তার বিকাশ, নির্বাচন, গণমাধ্যম, সমাজ সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর চিন্তা ও গবেষণা করে চলেছেন। তিনি বাংলাদেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও তার কৌশল নিয়ে বেশ কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সেই বইগুলো পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। তার সর্বশেষ বই ‘সাঈদ বদিউজ্জামান নুরসী’ সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় বিগত কয়েকমাস ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কুমরী কালিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনার পর শেরপুর জিকেএম ইন্সটিটিউশনে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। অষ্টম শ্রেণীতে তিনি আবাসিক বৃত্তি পান। ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে ৪টি বিষয়ে লেটারসহ এসএসসি পরীায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন। পুরো শেরপুরে একজন ভালো ছাত্র হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছাত্রজীবন হতেই একজন বিনয়ী ভদ্র অমায়িক মানুষ হিসেবে সর্বজনবিদিত। ১৯৬৭-৬৯ সেশনে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু দেশে ’৬৯ এর গণআন্দোলন শুরু হওয়ায় পরীায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৭১ (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) সালে মোমেনশাহী নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন।
শেরপুরের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মরহুম কাজী ফজলুর রহমানের আহ্বানে জিকেএম ইন্সটিটিউটে নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন তিনি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। কলেজে পা দিয়েই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম ঢাকা মহানগরীর সভাপতি এবং পরে সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন। ১৯৭৮ সালের ১৯ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং একমাস পরই নির্বাচনের মাধ্যমে সেশনের বাকী সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮-৭৯ সালেও শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পুন:নির্বাচিত হন।
বিশ্ব মুসলিম যুব সংস্থা (ওয়ামী) এবং বাংলাদেশ সরকারের যুব মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ১৯৭৯ সালে মৌচাক স্কাউট ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক ইসলামী যুব সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এতে তিনি প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় যুব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শেরপুরের আরেক কৃতী সন্তান মরহুম খন্দকার আব্দুল হামিদ। উলেখ্য যে, এই সম্মেলনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন।
ছাত্র জীবন শেষে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলা মাসিক ‘ঢাকা ডাইজেস্ট’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তাকে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোনার বাংলায় ুরধার লেখনির কারণে এরশাদের শাসনামলে পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘নতুন পত্র’ প্রকাশ করেন, অবশ্য এ পত্রিকাটির প্রকাশনা বর্তমানে বন্ধ আছে। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দশ বছর দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জাতীয় প্রেস কাবের একজন স্থায়ী সদস্য এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৮১-৮২ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য ঢাকা মহানগরী জামায়াতের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব দেয়া হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশি সময় দেবার প্রয়োজনেই ১৯৯৩ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি জামায়াতের অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করছেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কমিটি ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে বিগত স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ১৯৮৩-৯০ পর্যন্ত তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে তিনি জামায়াতের নির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও বিভিন্ন কমিটির সদস্য এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মতায় আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেয়। এ সময় তিনি ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য গড়ে তোলায় দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছেন, যা জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। চারদলের কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসাবে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য প্রচেষ্টায় তিনি অকান্ত পরিশ্রম করেছেন। [সূত্র]
No comments:
Post a Comment