Thursday, May 9, 2013

আমার মেডিকেল জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন


৫ তারিখের অভিজ্ঞতা। আমার মেডিকেল জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।।


পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা। একতরফা যুদ্ধ। পল্টনমোড় আর নাইটিংগেল মোড় থেকে পুলিশ সমানে গুলি করছে। দুই মোড়ের মাঝখানে বিজয়নগর রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। কারও হাতে কোন অস্ত্র নাই। সর্বোচ্চ একটা লাঠি। কেউ ইন ভেঙ্গে টুকরোগুলো পুলিশের দিকে ছুড়ে মারছে। আবার কেউ ভয়ঙ্কর কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচার জন্য আশপাশ থেকে গাছ-কাঠ জড়ো করে রাস্তার মাঝখানে আগুন দিচ্ছে। কেউবা পুলিশের সাঁজোয়া যানগুলোকে বাঁধা দিতে গাঠ কেটে রাস্তা ব্লক করে দেয়ার চেষ্টা করছে।

এর মধ্যেই আমরা মেডিকেল ক্যাম্প নিয়ে একটা গলির মধ্যে অবস্থান নিয়েছিলাম। একটার পর একটা রোগী আসছে। পল্টনের দিক থেকে প্যাসেন্ট আসছিল বেশি। কেউ নিয়ে আসছিল হাঁটিয়ে। কেউ আনছিল মোটরবাইকে করে। আমাদের হাতে গছিয়ে দিয়েই আবার দ্রুত চলে যাচ্ছিল পল্টনের দিকে। যেন চলমান এম্বুলেন্স।


আমাদের বেড ছিল শুধু দুটি। রাস্তায় সামিয়ানা-কাপড় বিছিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। আমরা এম্বুলেন্স নিয়েই গিয়েছিলাম। সিভিয়ারলি ইনজুরড প্যাসেন্টদের ফাস্ট এইড দিয়েই এম্বুলেন্সে করে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল। এর মধ্যেই আছরের নামাযের সময় তায়াম্মুম করে রাস্তায় নামাযে দাঁড়িয়েছিলাম। জামাত করছিলাম আমরা কয়েকজন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ হানা দেয় আমাদের গলিতে। তিন রাকাত শেষ হয়েছে তখন। শত শত মানুষের দিগ্বিদিক দৌড়া-দৌড়ি। নামায অসমাপ্ত রেখেই পেছন দিকে দৌড় দিলাম। নইলে মানুষের পায়ের তলায় পড়ে পিষ্ট হয়ে রাস্তায় মিশে যাওয়ার চান্স ছিল। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে পুলিশ চলে যায়। আমরা আবার একটু ভিতরের দিকে গিয়ে আমাদের ক্যাম্প বসাই। চিকিৎসা চলছিল। মাগরিবের নামাযও পড়লাম সময়মত।

এর মধ্যেই পুলিশ সম্ভবত অন্যদিকে সরে গিয়েছিল। আমরা কয়েকজন নাইটিংগেল মোড়সহ ইসলামী ব্যাংক হসপিটালে ঘুরে আসি। লোকজন প্রচুর ক্ষেপে ছিল। নিরীহ মানুষের উপর গুলি ছোড়ার কারণেই আসলে মানুষের ক্ষোভ জমছিল। আমাদের মনে হয়েছে পুলিশকে পেলে ছিড়ে খেয়ে ফেলবে। কিছুক্ষণ পরিস্থিতি দেখে ক্যাম্পে ফিরে আসি আমরা।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমাদের ক্যাম্প এলাকায় আবার পুলিশের হানা। এবারে পুলিশ গুলি ছোড়ে। আমরা পালাতে গিয়েও আমাদের তিনজন ভাই আহত হয়। এক ভাইয়ের শরীরের এক পাশে অনেকগুলো পিলেট বিঁধে। আমার মাথায় লাগে তিনটা। সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে শতশত। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আমরা আমাদের ক্যাম্পের ৮-১০ জন সিনিয়র বাদে সবাইকে যেকোন উপায়ে হলে চলে আসার জন্য বলি।

ক্যাম্প তছনছ হয়ে গিয়েছিল। আমরা আগের জায়গা থেকে ক্যাম্প সরিয়ে আরো ভিতরে নিয়ে যাই। ওখানেও লোকজনের সহায়তায় চিকিৎসা চলছিল। এর মধ্যেই দুইজন সিরিয়াস প্যাসেন্ট আসে। একজনের মাথা ফেটে গিয়েছে। কোনভাবেই ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছিল না। আমাদের এক সিনিয়র ডাক্তার ভাই ইনস্ট্যান্ট সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্টিচ পর্যন্ত দিতে বাধ্য হলেন। আরেকজন ভাইয়ের ডান হাতের বাহুর উপরের দিকে গুলি ঢুকেছে। সেটা বের করতে প্রায় তিন স্কোয়ার ইঞ্চি গর্ত করতে হয়েছে। সেখানেও ড্রেসিং দিয়ে আটকে দেয়া হল।

এর মধ্যেই কিভাবে যেন খাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেল। আমরা দুই-তিনজন করে ভাগেযোগে খেয়ে নিলাম। আবার উত্তেজনা শোনা যাচ্ছিল। পুলিশ আসবে আসবে ভাব। আমরা কয়েকজন গলি থেকে বের হয়ে বিজয়নগর রাস্তায় আসলাম পরিস্থিতি বুঝার জন্য। দেখলাম তখনও গাছ কেটে বেরিকেড দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগুন ধরানো হচ্ছে। চারদিকে অন্ধকার আর ধোয়া। কাঁদানের গ্যাসের ঝাঁঝ।

সেখান থেকে ফিরে আবার দুঃসংবাদ। এর মধ্যেই স্থানীয় ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। টেবিল-চেয়ার-ওষুধপত্র সব। ওরা চলে যাওয়ার পর কিছু ওষুধপত্র আশপাশের লোকজন উদ্ধার করে পাশের একটা মসজিদে রেখে আসে। আমাদের ভাইয়েরা পাশের একটা স্টোররুমে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই সে যাত্রা বেঁচে যায়। এরপর আর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় নি।

আমরা আমাদের সিরিয়াস প্যাসেন্ট দুজন নিয়ে পাশের একটা মসজিদে আশ্রয় নেই। সেখানেই হালকা ম্যানেজমেন্ট চলছিল। হসপিটালাইজেশন জরুরি ছিল। এম্বুলেন্স যোগাড়ের চেষ্টা চলছিল। ইসলামী ব্যাংক হসপিটাল খুব কাছে হওয়ার পরও এম্বুলেন্স যোগাড় করা যাচ্ছিল না। এম্বুলেন্স আসতে চাচ্ছিল না এই যুদ্ধাবস্থার মধ্যে। রাত প্রায় ১২ টার দিকে আমরা মসজিদ ছাড়ি। তখনও এম্বুলেন্স যোগাড়ের চেষ্টা চলছিল।

পাশেই আমাদের এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে পরিচয় হয়েছিল আমাদের এক ভাইয়ের। আমরা দশজন তাঁর ফ্লাটে রাত কাটাই। মতিঝিলের এক ভাইয়ের সাথে আমরা সর্বশেষ রাত দুটোয় যোগাযোগ করেছিলাম। তখনও কোন সমস্যা হচ্ছিল না সেখানে। কিন্তু সকালে উঠে যখন শুনি মতিঝিল সাফ করে দেয়া হয়েছে তখন শরীর কাঁপছিল। নিজেকে খুব খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি নিরস্ত্র নিরীহ মানুষগুলোর উপর রাতের অন্ধকারে সরকারের সুশিক্ষিত অস্ত্রধারী বাহিনী এইভাবে অপারেশন পরিচালনা করবে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ফজরের নামাজ পড়ে এপ্রোন কাঁধে নিয়ে হেঁটে হেঁটে হলের দিকে যাত্রা করলাম। রাজপথের আকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা নিয়ে আসলাম।

সামনে নিশ্চিতভাবেই আরও কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে ইসলামী আন্দোলনের জন্য। আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী আমরা। আপনাদের কাছে দোয়া ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই আমাদের।।


No comments:

Post a Comment